ওজন কমান, সারবে ডায়াবেটিস

এক গবেষণায় দেখা গেছে তিন মাস প্রতিদিন ৮৫০ ক্যালরিযুক্ত খাবার গেলে এবং ওজন কমাতে পারলে অন্তত দুই বছর টাইপ-টু ডায়াবেটিস থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।

ইংল্যাণ্ডে বেশ কিছু রোগীর ওপর পরীক্ষা চালিয়ে গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

তারা বলছেন, ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগের জন্য নিয়মিত ওষুধ খাওয়া বন্ধ রাখতে এবং রোগ ঠেকিয়ে রাখতে এই পদ্ধতি একটা সমাধানের পথ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে ধারণা করা হতো টাইপ-টু ডায়াবেটিস একবার হলে আর সারে না, সারা জীবন ধরে ভুগতে হয়। বরং দিনে দিনে তা আরও খারাপের দিকে যায়। কিন্তু নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে।

যুক্তরাজ্যে প্রতি ১৬ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন টাইপ-টু ডায়াবেটিসের শিকার।

টাইপ-টু ডায়াবেটিসে শরীরে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণবিহীন হয়ে পড়ে এবং এর থেকে নানাধরনের জটিলতা তৈরি হয়, যেমন দৃষ্টির সমস্যা, হৃদরোগ এবং অঙ্গহানি।

৫৮ বছর বয়স্ক জো ম্যাকসোরলি থাকেন স্কটল্যাণ্ডের গ্লাসগো শহরের কাছে। ছয় বছর আগে তার টাইপ-টু ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। তাকে চিকিৎসক দু রকম ওষুধ দেবার পরেও তিনি তার রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছিলেন।

প্রথমদিকে তিনি যখন প্রতিদিন কম ক্যালরির তরল খাবার পরীক্ষামূলকভাবে খেতে শুরু করেছিলেন, তার খুব কষ্ট হয়েছিল। ব্যাপারটা খুব কঠিন মনে হয়েছিল কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তিনি সুফল পেতে শুরু করেন। ১২ সপ্তাহের মধ্যে তার ওজন ৯০ কেজি থেকে ৭৩ কেজিতে নেমে আসে।

এ সম্পর্কে জো ম্যাকসোরলি জানান, এরপর যখন তিনি আবার তরল ছেড়ে সবরকম খাবার শুরু করলেন তখনই ছিল সবচেয়ে কঠিন সময়। ‘শুধু তরল খেয়ে থাকাটা ছিল আমার জন্য যাত্রার প্রথম ধাপ। তবে নিজের ভাগ্য নিজের হাতে তুলে নেবার জন্য সেটা আমাকে পরবর্তী ধাপে পৌঁছে দিয়েছিল।’

এর দুই বছর পর জো ম্যাকসোরলির ওজন ৭৭ কেজিতে স্থিতিশীল হয়।

এখন জো প্রতিদিন নিয়মিত ব্যায়াম করেন এবং অবসরগ্রহণের পর মানুষকে জীবনযাপনের ধারা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেবার কথা চিন্তাভাবনা করছেন।

স্কটল্যাণ্ডে ম্যাকসোরলিসহ ১৪৯ জন ১২ থেকে ৩০ সপ্তাহ ধরে কম ক্যালরিযুক্ত খাদ্য গ্রহণের এক কর্মসূচিতে অংশ নেন। ওজন কমানোর জন্য তাদের কম ক্যালরিযুক্ত কেবল তরল খাবার এবং পানীয় খেতে হতো।

ওজন কমার পর কয়েক সপ্তাহ ধরে তাদের ধীরে ধীরে আবার সাধারণ খাবার খেতে দেয়া হয়।

এক বছর পর এদের মধ্যে ৬৯ জন রোগমুক্ত হন। মাত্র ৪ শতাংশ রোগীকে শর্করা কমাতে ওষুধের সাহায্য নিতে হয়। আর দুবছর পর এদের মধ্যে ৫৩ জন রোগমুক্ত থেকে যান এবং তাদের কোনরকম ওষুধ খেতে হয় না।

প্রতি মাসে তাদের সঙ্গে বৈঠক করে কীভাবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করা যায় সে বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হয়। তাদের ওজন যদি আবার বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়, তাদের সাহায্য করার জন্য আবার তরল খাবার খেয়ে ওজন কমানোর কর্মসূচিতে যোগ দেবার জন্য উৎসাহিত করা হয়।

ওজন কমানোই কি সবকিছু?

এই গবেষণার সঙ্গে জড়িত অধ্যাপক রয় টেইলর বলছেন: ‘‘এই ফলাফল বহুমূত্র রোগীদের জন্য খুবই আশাব্যঞ্জক। এতদিন মনে করা হতো টাইপ-টু ডায়াবেটিস একবার ধরলে আর ফেরার পথ নেই। এখন সেই ধারণার ওপর এবার যবনিকা টানার পথ খুলে গেছে।’

তারা বলছেন, যারা ওজন কমিয়ে বহুমূত্র রোগ ঠেকানোর কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন তারা গড়ে ১০ কেজির মত ওজন কমিয়েছেন এবং তা ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন।

কিন্তু লণ্ডনে কিংস কলেজের ড: নিকোলা গেস বলছেন ওজন কমানোটাই যে একমাত্র পথ তা এখুনি বলা যাবে না। কারণ খুব কম সংখ্যক হলেও কয়েকজন রোগীর ক্ষেত্রে এই রোগ আবার ফিরে এসেছে। তবে সেটা কেন হয়েছে তা বুঝতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।

ড: নিকোলা গেস মনে করেন, হয়ত এমনটা হয়ে থাকতে পারে, ওজন কমানোর কাজটা তাদের জন্য একশভাগ কাজ করেনি। অথবা তারা দীর্ঘদিন ধরে টাইপ-টু ডায়াবেটিসের রোগী ছিলেন। কিংবা তাদের বংশগত জিন এক্ষেত্রে একটা ভূমিকা রেখেছে।

তবে টাইপ-টু ডায়াবেটিস একটি জটিল রোগ। এই রোগের নিরাময় বা প্রতিরোধ যে সকলের জন্য একভাবে কাজ করবে এক্ষুণি তা বলা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেছে যুক্তরাজ্যের ডায়াবেটিস ইউকে সংস্থা যারা এই গবেষণার জন্য অর্থায়ন করেছে।