জালিয়াতির দায়ে চাকুরিচ্যুত কর্নেল শহীদ উদ্দিনের ৫ বছরের কারাদণ্ড

অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে চাকুরিচ্যুত সেনা কর্মকর্তা কর্নেল শহীদ উদ্দিন খানের দলিল জালিয়াতি ও নানাবিধ অপকর্মের কাহিনী। সহজ সরল মানুষের সাথে প্রতারণা করে দলিল জালিয়াতির মাধ্যমে তাদের জমি জোরপূর্বক দখল করেছে কর্নেল শহীদ উদ্দিন ও তার ক্যাডার বাহিনী। পরবর্তীতে স্বাক্ষর জাল করে অবৈধভাবে দখলকৃত জমি বিক্রয়ের অভিযোগে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় বিজ্ঞ আদালত এই প্রতারককে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো ৩ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। এছাড়া আরো নানা ধরণের দুর্নীতি, প্রতারণা ও মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে এই প্রতারক।

চাকুরিচ্যুত কর্নেল শহীদ উদ্দিন খান পারিবারিক সম্পত্তি বন্দিশাহী কোল ষ্টোরেজের বিক্রয়লব্ধ আড়াই কোটি টাকার উপরে আত্মসাৎ করেছেন। কর্নেল শহীদ এবং তার স্ত্রী ফারজানা আহমেদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি দেখে অনেকেই কর্নেল শহীদকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করার জন্য অনুরোধ করেন।

চাকুরিচ্যুত কর্নেল শহীদ উদ্দিন খানে শশুর- মৃত কাজী মশিউর রহমানের আলোচিত ডেসটিনি বন্দিশাহী কোল ষ্টোরেজ লিমিটেডের বিক্রয়লব্ধ টাকা ভাগ-বাটোয়ারা সংক্রান্ত কোর্টের একটি রায় পর্যালোচনা করে দেখা যায়। এই টাকার অর্ধেক কর্নেল শহীদের একমাত্র শ্যালক মুশফিকুর রহমানকে প্রদান করার বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা থাকলেও এই নির্দেশনাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কর্নেল শহীদ এবং তার স্ত্রী ফারজানা আনজুম পুরোটাই প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করেন।

স্বাক্ষর নকল করে জাল দলিলের মাধ্যমে অবৈধভাবে জমি বিক্রয়ের অভিযোগে কর্নেল শহীদকে প্রধান আসামি করে গত ৩০ ডিসেম্বর ২০০৯ সালে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে মামলা করেন উত্তরায় বসবাসকারী মোহাম্মদ ইউনুস আলী। যার মামলা নম্বর ৪৪৬৬/২০০৯।

ভুক্তভোগী এবং ২ নাম্বার স্বাক্ষী মিজানুর রহমান বলেন, সে দলিল করেছে কিভাবে, টিপসই কিভাবে নিয়েছে, আমি জানি না। এটা সম্পূর্ণভাবে জালিয়াতি। কর্নেল শহীদের প্রতারণার বিষয়টি সিআইডিতে প্রমাণ হয়েছে। সে আমার সর্বনাশ করেছে। আমাকে হত্যা করার জন্য পায়ে গুলি করেছে। আমি আমার তিনটি ছেলেকে বাঁচানোর জন্য পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমি কর্নেল শহীদের বিচার চাই।

মামলার ভুক্তভোগী এবং ৩ নাম্বার স্বাক্ষী মো. মোতালেব হোসেন বলেন, কর্নেল শহীদ সম্পূর্ণভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে যে প্রতারণা করেছেন তা আদালতে প্রমাণ হয়েছে।

এসকল অভিযোগে কর্নেল শহীদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলে অবৈধভাবে প্রচুর অর্থ খরচ করে নিজে সরাসরি আদালতে হাজির না হয়ে তিন বছরে মোট ছয় মাস করে ছয়বার জামিন নিয়েছেন- যা ইতিহাসে নজিরবিহীন। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকা অবস্থায় আদালতের নির্দেশনা ব্যতীত দেশ ত্যাগকরার কথা না থাকলেও তিনি পালিয়ে লন্ডনে চলে যান।

এভাবেই কর্নেল শহীদের অপতৎপরতা চলতে থাকে এবং এই মামলার বিরুদ্ধে কর্নেল শহীদ বিজ্ঞ আদালত বরাবর আপিল করেন। পরবর্তীতে আপিল নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত মামলার কার্যক্রমের বিষয়ে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয় এবং মামলার কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। মামলা চলাকালীন প্রায় দেড় বছরের উপরে কর্নেল শহীদ বিদেশে অবস্থান করায় মামলার কার্যক্রমে স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে বাদী পক্ষ আপিল করে। পরবর্তীতে এ বিষয়ে শুনানি হওয়ার পর আপিল বিভাগ মামলা উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ খারিজ করে দেন এবং মামলার কার্যক্রম চালানোর আদেশ প্রদান করেন।

ঘটনার প্রায় দীর্ঘ ৯ বছরেরও অধিক সময় পর মামলার রায় দেয়া হয়। রায়ে উল্লেখ করা হয়, স্বাক্ষর জাল করে অবৈধভাবে দখলকৃত জমি বিক্রয়ের অভিযোগে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় বিজ্ঞ আদালত এই প্রতারককে গত ২৮ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো ৩ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে।